রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২১ পূর্বাহ্ন
কাতারের রাজধানী দোহা কেঁপে ওঠে মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইসরায়েলি এক বিধ্বংসী হামলায়। গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব নিয়ে গোপন আলোচনার টেবিল বসার মুহূর্তেই চালানো হয় এই আকস্মিক আঘাত। প্রাণ হারান অন্তত ছয়জন—যার মধ্যে রয়েছেন হামাসের শীর্ষনেতা খলিল আল হায়ার ছেলে, তিনজন দেহরক্ষী এবং কাতারের নিরাপত্তা বিভাগের একজন কর্মকর্তা। তবে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রধান নেতারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। খবর দিয়েছে আলজাজিরা।
কাতারে চালানো এই আক্রমণ ছিল ইসরায়েলের বৃহৎ এক আঞ্চলিক পরিকল্পনার অংশ। মাত্র ৭২ ঘণ্টায় তেল আবিব হামলা চালিয়েছে একে একে ছয় দেশে—ফিলিস্তিন, সিরিয়া, তিউনিশিয়া, লেবানন, কাতার ও ইয়েমেন। সোমবার থেকেই শুরু হয় এই টানা বোমাবর্ষণ। শুধু গাজায় ওইদিন ১৫০ জন নিহত হয় এবং আহত হয় ৫৪০ জনেরও বেশি।
সেদিনই গাজার একটি হাসপাতাল মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। চিকিৎসার জন্য আনা ৩২০ জনের মধ্যে ৬৭ জন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রাণ হারান আরও ১৪ জন এবং দুর্ভোগ-ক্ষুধায় মারা যান দুই শিশুসহ ছয়জন। এর পাশাপাশি মঙ্গলবারের হামলায় নিহত হয় আরও ৮৩ জন এবং আহত হন অন্তত ২২৩ জন।
গাজার আকাশ প্রতিদিন আগুনে ভরে উঠছে। নতুন করে ধসে পড়ছে বহুতল ভবন, উচ্ছেদ করা হচ্ছে হাজারো পরিবারকে। অথচ গাজার ভেতরে নেই কোনো নিরাপদ আশ্রয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৬৪ হাজার ৬৫৬ মানুষ। এদের মধ্যে শুধু অনাহারেই মারা গেছেন অন্তত ৪০৪ জন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে হাজারো দেহ।
সোমবার দুপুরে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী একযোগে বোমাবর্ষণ চালায় লেবানের বেক্কা ও হারমেল জেলায়। প্রাণ যায় পাঁচজনের। সেনাবাহিনী দাবি করেছে, সেসব জায়গায় হিজবুল্লাহর অস্ত্রাগার ও সামরিক ঘাঁটি ছিল। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি। হিজবুল্লাহও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এই হামলার মধ্য দিয়ে কার্যত ভেঙে পড়ল গত বছরের নভেম্বরে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি।
পরদিন মঙ্গলবারও ইসরায়েল হামলা চালায় বারজা এলাকায়, যা বৈরুত থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে। এতে প্রাণ হারান হিজবুল্লাহর এক সদস্য।
সোমবার রাতভর সিরিয়ার একাধিক স্থানে টার্গেটেড হামলা চালায় ইসরায়েল। বিশেষত বিমানবাহিনীর ঘাঁটি, সামরিক ব্যারাক ও আবাসিক বাড়িগুলোতে বোমা বর্ষণ করা হয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সিরিয়ার মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। যদিও হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “এটি আমাদের সার্বভৌমত্বে সরাসরি আঘাত, যা জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ হুমকি।” সংস্থাটির হিসাব বলছে, চলতি বছরেই সিরিয়ায় ইসরায়েলের শতাধিক হামলা হয়েছে—৮৬টি বিমান হামলা ও ১১টি স্থল অভিযান। এতে ১৩৫টি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে এবং নিহত হয়েছেন অন্তত ৬১ জন।
একইসঙ্গে বাদ যায়নি ‘দ্য গ্লোবার সমুদ ফ্লোটিলা’। গাজার উদ্দেশে রওনা দেওয়া এ জাহাজকে দু’বার লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয় তিউনিশিয়ার উপকূলে।
ইসরায়েল থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কাতার প্রথমবারের মতো এভাবে টার্গেটে পরিণত হলো। ওয়েস্ট বে লাগন এলাকার একটি বহুতল আবাসিক ভবনে হামলা চালানো হয়, যেখানে রয়েছে বিদেশি দূতাবাস, স্কুল, শপিং সেন্টার ও হাসপাতাল। এতে প্রাণ হারান ছয়জন।
বুধবার সকালে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আবারও বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। টানা এক মাসের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয়বার সানা বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হলো। গত ৬ মে-এর হামলায় ধ্বংস হয়েছিল টার্মিনাল ভবন ও রানওয়ে।
শুধু তাই নয়, গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর ভেতরে হুতি প্রশাসনের বৈঠকেও চালানো হয়েছিল আকস্মিক হামলা। প্রাণ হারান হুতি প্রধানমন্ত্রী আল-রাহাওয়িসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা।